পারিবারিক আদালত কি শুধু মুসলমানদের জন্য?: মারুফ আল্লাম Maruf Allam

ঝুমুর রানী বাড়ি নরসিংদী গ্রামের শিবপুরে। নরসিংদী কলেজে স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় তার বিয়ে হয় জয়দেবের সঙ্গে। বিয়ের প্রথম দুই বছর বেশ ভালোই কাটে জয়দেব-ঝুমুর দম্পতির। কিন্তু এর পর থেকেই তাদের মধ্যে যৌতুকসহ নানা বিষয় নিয়ে কলহ হতো। একপর্যায়ে ঝুমুরকে জোর করে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। জয়দেব কোনো খোঁজখবর রাখে না তার। এরকম অবস্থায় ঝুমুরের আইনি প্রতিকার কী? ঝুমুর কি পারে পারিবারিক আদালতে মামলা করে দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে? হিন্দু বিবাহিত নারী যে স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী, সেটিও কি পারিবারিক আদালতে মামলা করে ঝুমুর আদায় করে নিতে পারে? নাকি এই আদালত কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের জন্যই গঠন করা হয়েছে?

বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের পারিবারিক নানাবিধ সমস্যার আইনি সমাধানের লক্ষ্যে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ আমল পর্যন্ত বহু পারিবারিক আইন প্রণয় করা হয়েছে। যেমন ১৯৬১ সালে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ। ১৯৩৯ সালে পাস করা হয়েছে মুসলিম বিবাহ-বিচ্ছেদ আইন, একই ভাবে হিন্দু জনগোষ্ঠীর জন্য করা হয়েছে ‘সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকারসংক্রান্ত আইন ১৯৩৭’, খ্রিস্টানদের জন্য প্রচলিত আছে খ্রিস্টান ম্যারেজ এ্যাক্ট ১৮৭২, সাকসেশন এ্যাক্ট ১৯২৫ ইত্যাদি।

কিন্তু কোনো পারিবারিক সমস্যার সৃষ্টি হলে এতসব আইন থাকা সত্ত্বেও কোন জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্যই পৃথক কোনো আদালত ছিল না, যেখানে গিয়ে এসব আইনের অধীনে প্রতিকার চাওয়া যাবে। ফলে অন্যসব মামলার বিচারের মতো পারিবারিক ব্যাপারগুলো নিয়েও সাধারণ দেওয়ানি আদালতের দরজাতেই বিচারপ্রার্থীদের যেতে হতো। দেওয়ানি আদালতগুলোয় এমনিতেই মামলার ভারে নূ্যব্জ, তার ওপর বিপুল পরিমাণ পারিবারিক মামলা দায়ের হওয়ার কারণে আদালত ও বিচারপ্রার্থী উভয়কেই দারুণ সমস্যার মধ্যে পড়তে হতো।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৫ সালে প্রণয়ন করে ‘পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ’। কিন্তু প্রণয়নের পর থেকেই আইনের ভাষ্য ও এর প্রয়োগ নিয়ে নানারকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান বিভ্রান্তি হচ্ছে আইনটির অধীনে কোন কোন জনগোষ্ঠী আদালতের কাছে পারিবারিক সমস্যা নিয়ে যেতে পারবে? আইনটি কি শুধু মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্যই?

এই বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কারণ আইনটির ৫ ধারায় বলা হয়েছে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর বিধান সাপেক্ষে পারিবারিক আদালতের নিম্নোক্ত বিষয়গুলোয় বিচার করার এখতিয়ার থাকবে: বিয়েবিচ্ছেদ, মোহর, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, ভরণপোষণ এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মাদারি।

এই পারিবারিক আদালত কেবল মুসলিমদের জন্যই প্রযোজ্য কিনা, এই ধারা অনুসারে দুটি কারণে সেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত আদালতের এখতিয়ারকে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের অধীনে প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত আদালতকে এমন কিছু বিষয়ে এখতিয়ার দেয়া হয়েছে, যার একটি একচ্ছত্রভাবে মুসলিম পারিবারিক আইনের ধারণা। সেটি হলো মোহর।
আইনের এই বিভ্রান্তি পরে অবশ্য আদালতের বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী রায়ের মধ্যদিয়ে নিরসন হয়েছে। যেমন কৃষ্ণপদ তালুকদার বনাম গীতশ্রী তালুকদার (১৪, বিএলডি, ১৯৯৪, ৪১৫) মামলাটি শুরুতে উল্লেখ করা প্রয়োজন। এই মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ কেবল মুসলিমদের জন্য পারিবারিক আদালতগুলো গঠিত বলে অভিমত দিয়ে বলে, ‘যেহেতু পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-এর ৫ ধারায় স্পষ্ট করে বলা আছে, পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর সাপেক্ষে নির্ধারিত হবে। তাই একথা বলার আর অবকাশ থাকে না যে, অধ্যাদেশের ৫ ধারায় যে পাঁচটি বিষয়ে যেমন বিবাহ-বিচ্ছেদ, মোহরানা, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মাদারিত্ব পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার আছে, এসব ক্ষেত্রে শুধু মুসলিম প্রার্থীরাই আদালতের কাছে আসতে পারবে।’

তবে একই মামলার একজন আইনজীবীর মতামতও এখানে তুলে ধরা প্রয়োজন, যিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটি দেখেছেন। তার মতে, আইনের প্রস্তাবনা এবং ধারা ১(২)-এ যে আঞ্চলিক এখতিয়ারের কথা বলা হয়েছে, তা থেকে এটা কোনোভাবেই বলা যায় না, আইনটি কেবল মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য প্রযোজ্য। প্রস্তাবনায় রয়েছে, যেহেতু পারিবারিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য পৃথক পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন, তাই এই আইনটি প্রণয়ন করা হচ্ছে। আর ধারা ১(২)-এ বলা হচ্ছে, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ছাড়া সমসত্ত্ব বাংলাদেশেই পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার থাকবে। সুতরাং কোথাও বলা হচ্ছে না, শুধু মুসলমান জনগোষ্ঠীই আদালতের বিচারপ্রার্থী হতে পারবে। তবে ৫ ধারায় উলি্লখিত বিবাহ-বিচ্ছেদ, মোহরানা, বিষয় দুটির ক্ষেত্রে হিন্দু জনগোষ্ঠী আদালতের সাহায্য চাইতে পারবে না। কারণ মোহরানা মুসলিম বিয়ের একটি শর্ত, আর বাংলাদেশে তো হিন্দু সম্প্রদায়ে বিবাহ-বিচ্ছেদের বিধান নেই। তবে অন্য তিনটি বিষয়ে সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মাদারি, ভরণপোষণ, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, এসব ব্যাপারে সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যই আদালতের দরজা খোলা থাকা প্রয়োজন।

এর কিছুদিন পর নির্মল কান্তি দাস বনাম শ্রীমতী বিভা রানী (১৪, ১৯৯৪, বিএলডি, ৪১৩) মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ সম্পূর্ণ ভিন্ন রায় প্রদান করে। আদালত তার রায়ে বলে, ৫ ধারায় যাই থাকুক না কেন, ৩ ধারায় কিন্তু এ কথা বলা আছে যে বাংলাদেশে প্রচলিত ‘অন্য যে আইনে’ যে বিধানই থাকুক না কেন, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ প্রাধান্য পাবে। এ থেকে বোঝা যায় মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ১৯৮৫ সালের অধ্যাদেশের অধীনে থাকবে। তাই এ মামলায় আদালত তার রায়ে বলল, এই কারণে একজন মুসলমান স্ত্রীর মতো একজন হিন্দু মহিলাও ভরণপোষণের জন্য পারিবারিক আদালতে অবশ্যই মামলা করতে পারবে। এরপর মেহের নিগার বনাম মো. মজিবুর রহমান (১৪, বিএলডি, ১৯৯৪, ৪৬৭) মামলাতেও আদালত একই রকম রায় প্রদান করে।

এই দুটি মামলার রায় থেকে যেটা দেখা গেল হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চগুলো বিষয়টিতে একমত হতে পারছিল না। আর এ কারণে নিম্ন আদালতে উচ্চ আদালতের এই রায়কে নজির হিসেবে পেশ করাতে বেশ ঝামেলা হচ্ছিল।

তবে ১৯৯৭ সালে পচন ঋষি দাস বনাম খুকু রানী দাস এবং অন্যান্য (৪৭ ডিএলআর-৫০) মামলার রায়ে আদালত যে মতামত প্রকাশ করে, তার ফলে সব ধরনের দ্বিধার অবসান ঘটে। রায়ে আদালত বলে, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে বসবাসকারী সব ধর্মের মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এর কারণ প্রথমত, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ যে কেবল মুসলমানদের জন্যই প্রযোজ্য, তা আইনের নাম দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এই উদ্দেশ্য যদি পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-এর প্রণেতাদের প্রভাবিত করত, তাহলে আইনটির নাম হওয়া উচিত ছিল মুসলিম পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫। তা কিন্তু হয়নি। দ্বিতীয়ত, আইনের কোথাও কিন্তু কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীকে বাদ দেয়া হয়নি। আবার কোথাও কিন্তু এটাও বলা হয়নি, আইনটি কেবল মুসলমানদের জন্যই প্রযোজ্য। তৃতীয়ত যারা বলে থাকেন, অধ্যাদেশের ৫ ধারায় যে পাঁচটি বিষয়ে আদালতের যে এখতিয়ার আছে, তার সব কটিই যেহেতু মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তাই স্বভাবতই বলা যায়, আইনটি আসলে মুসলমানদের জন্যই। এই যুক্তি খণ্ডন করে আদালত বলে, কোনো কোনো বিষয় কোনো একটি ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য হবে না বলেই সম্পূর্ণ আইনটিই তাদের জন্য অপ্রযোজ্য বলা যাবে না।

সুতরাং সব মিলিয়ে বলা যায়, পারিবারিক আদালতে যে পাঁচটি বিষয়ের বিচার করা হয়ে থাকে, সে বিষয়গুলোর যখনই কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে মিলে যাবে, তিনিই আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন প্রতিকারের জন্য।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s